
বিএনপির সিনিয়র নেতা এবং নবগঠিত সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ঝড় উঠেছে। ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটিকে বাংলা ভাষার পরিপন্থী এবং উর্দুইজমের অংশ হিসেবে অভিহিত করার পর খোদ বিএনপির ভেতরে এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নেতাদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
গতকাল শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সিরাজগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এক আলোচনা সভায় ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘‘আজকের জেন-জি যদি ইনকিলাব বলে, তবে আমার রক্তক্ষরণ হয়। বাংলাকে ধারণ করতে হলে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ চলবে না। এগুলো তাদের ভাষা যারা আমাদের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল।’’ তিনি আরও যোগ করেন যে, এই মন্তব্যের জন্য তাকে ‘ভারতের দালাল’ বলা হলেও তিনি পরোয়া করেন না।
টুকুর এই মন্তব্যের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। তার এই মন্তব্যকে তরুণ প্রজন্ম ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ’ হিসেবে দেখছে, যার ফলে ফেসবুকজুড়ে এখন ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। নেটিজেনরা পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলছেন, যে ভাষায় কথা বললে হিন্দুত্ববাদের দালালদের অন্তর জ্বলবে, সেটাই এখন প্রতিরোধের ভাষা। তারা ইতিহাস তুলে ধরে বলছেন, ‘ইনকিলাব’, ‘আজাদি’, ‘ইনসাফ’ ও ‘মজলুম’ শব্দগুলো যেকোনো মুক্তি-সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
জুলাই বিপ্লবের নেতাদের কঠোর জবাব
মন্ত্রীর এই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ঢল নামে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের শীর্ষ নেতারা সরাসরি পাল্টা স্ট্যাটাস দিয়ে এর প্রতিবাদ জানান।
কুমিল্লা-৪ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ ফেসবুকে শুধু ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ লিখে পোস্ট দেন। তার পোস্টে প্রায় ১০ লাখ রিয়েকশন পড়ে, যা মন্ত্রীর বিতর্কিত বক্তব্যের সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাবেক উপদেষ্টা ও এনসিপি মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সরাসরি প্রশ্ন তুলে লেখেন, ‘‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ শুনলে ব্লিডিং হয়, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ শুনলে ব্লিডিং হয় না মাননীয় মন্ত্রী?’’
অন্যদিকে, ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ ও এনসিপির অপর শীর্ষ নেতা সারজিস আলম কঠোর ভাষায় লেখেন, ‘‘যে স্লোগান স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছে, সেই স্লোগান তাদের উত্তরসূরিদের ভয়ের কারণ তো হবেই!’’
টুকুর ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ বিরোধী মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় এনসিপি নেতা নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী স্লোগান দেন ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ! চাঁদাবাজ মুর্দাবাদ!’ তার দেওয়া পোস্টটিও মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যায়।
ক্ষুব্ধ বিএনপি ও সমমনা দলগুলো
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর এই মন্তব্যে খোদ বিএনপি ঘরানার মধ্যেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। দলটির অফিশিয়াল পেজগুলোতে বিভিন্ন সময় আন্দোলনের ডাক দিতে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ব্যবহার করা হয়েছে। জামায়াতে আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান তার প্রতিক্রিয়ায় লেখেন, ‘‘ইনশাআল্লাহ, আগামীর বাংলাদেশ ইনসাফের বাংলাদেশ। ইনকিলাব জিন্দাবাদ।’’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে ‘‘মোদের গরব, মোদের আশা, আ-মরি বাংলা ভাষা ইনকিলাব জিন্দাবাদ।’’
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মন্ত্রী যে শব্দগুলোকে ‘বাংলা ভাষার পরিপন্থী’ বা ‘ভাষার দখলদার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, সেগুলো খোদ বিএনপির অফিশিয়াল প্ল্যাটফর্মসহ দলটির বিভিন্ন লেখনীতেও ব্যাপকভাবে বিদ্যমান।
মন্ত্রীর বক্তব্যের বিপরীতে সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য দেখা গেছে বিএনপির নিজস্ব প্রচারণায়। অনুসন্ধানী পোর্টাল ‘দ্য ডিসেন্ট’-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ২০২৪ সালের ৪ ও ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত মূহূর্তে বিএনপির ভেরিফাইড ফেসবুক পেজ থেকে একাধিকবার “ইনকিলাব জিন্দাবাদ!” স্লোগানটি ব্যবহার করা হয়েছে।
৪ আগস্টের এক পোস্টে লেখা ছিল, “ইনকিলাব জিন্দাবাদ! ঢাকা আসছে জনতা, ছাড়তে হবে ক্ষমতা।” এমনকি দলটির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিভিন্ন বক্তব্যে ‘ইনসাফ’, ‘জুলুম’ ও ‘ফয়সালা’ শব্দগুলোর নিয়মিত ব্যবহার পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত কিংবা বামপন্থী দল সবাই রাজনৈতিক লড়াইয়ে এই শব্দগুলো ব্যবহার করে। ২০২২ ও ২০২৩ সালের জনসভায় ফ্যাসিস্ট হাসিনা নিজেই বিএনপির বিরুদ্ধে ‘জুলুম’ শব্দের ব্যবহার করেছেন। আবার ২০২৫ সালের জুন মাসে আওয়ামী লীগের পেজ থেকে ‘চূড়ান্ত ফয়সালা’র ডাক দেওয়া হয়েছিল। বামপন্থী দল ‘গণসংহতি আন্দোলন’ এবং ‘ইসলামী আন্দোলন’ও নিয়মিত ‘ইনসাফ’ ও ‘জুলুম’ শব্দগুলো ব্যবহার করে আসছে।
বিশেষজ্ঞ ও নেটিজেনরা বলছেন, ‘ইনকিলাব’ (বিপ্লব) একটি আরবি শব্দ যা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে জনপ্রিয় স্লোগান ছিল। এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা ভাষার বিরুদ্ধে নয়, বরং বিশ্বব্যাপী শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক। সাধারণ ব্যবহারকারীরা মন্ত্রীর অতীত পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলছেন, ২৪-এর বিপ্লবীরা সজাগ রয়েছে এবং জনআকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে গিয়ে ‘নব্য ফ্যাসিস্ট’ হওয়ার চেষ্টা করলে তার পরিণতি ভালো হবে না।











