
কথায় আছে ‘নিজে যতই শক্তিশালী হোন না কেন, প্রতিপক্ষকে কখনোই দুর্বল ভাবা উচিত নয়। প্রতিপক্ষকে ছোট করে দেখা নিজের পরাজয়ের কারণ হতে পারে।’ গত ৩১ জানুয়ারি বগুড়ার এক নির্বাচনী সভায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এবারের নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বসে থাকলে চলবে না, সবার কাছেই যেতে হবে। জনবিচ্ছিন্ন হয়ে জয়ের আশা করা যাবে না।’ তারেক রহমানের এই উপলব্ধি যথার্থ। এই উপলব্ধির আলোকে তার নির্বাচনী ফ্রেমওয়ার্ক সাজানো উচিত। এবারের নির্বাচনে বিএনপির ভুল করার সুযোগ নেই। দেশের রাজনীতিতে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল আওয়ামী লীগ। তারা এখন নেই। এবার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে একসময় বিএনপির ছায়ায় দেশের রাজনীতিতে বেড়ে উঠা জামায়াত। বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের পর দেশ-বিদেশে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হিসেবে বিবেচিত ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ সালের নির্বাচনগুলোর সংসদের আসন সংখ্যা ও ভোটের হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জনসমর্থনের দিক দিয়ে বিএনপির অনেক পেছনে জামায়াতের অবস্থান। আবার ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর জামায়াতের ‘অতি বাড়াবাড়ি রকম আওয়াজ’ এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় দলটির ‘বট’ বাহিনীর নিরবচ্ছিন্ন প্রচারণায় মনে হচ্ছে দলটি যেন ক্ষমতায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে; অপেক্ষা শুধু নির্বাচন। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার লক্ষ্যে যা যা করা প্রয়োজন, জামায়াত তাই করছে। নির্বাচন এবং যুদ্ধের ময়দানে বিজয়ী হতে ন্যায়-অন্যায়, নীতি-নৈতিকতা গৌণ। নির্বাচন বা যুদ্ধে বিজয়ী হওয়াই মুখ্য। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও জামায়াত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ী হতে প্রকাশ্যে এবং পর্দার আড়ালে প্রয়োজনীয় সব কিছুই করছে। নির্বাচন যেহেতু পাওয়ার গেম। আদর্শ-দর্শন এখানে অনুপস্থিত। ফলে বিজয়ী হতে হলে প্রকাশ্যে-পর্দার আড়ালে যা করা দরকার, জামায়াত তাই করছে। প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে ভোটারদের অর্থ, কথা যেখানে যা প্রয়োজন সেভাবে নিজেদের পক্ষে টানছে। অন্য যে কেউ জামায়াতের দায়িত্বে থাকলে বর্তমান জামায়াত নেতারা যা করছেন, তাই করত। কিন্তু দেশের সবচেয়ে বৃহৎ এবং জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বিএনপি কী সেটি মোকাবিলার চেষ্টা করছে? নির্বাচনে বিজয়ী হতে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলে জামায়াত যে সুচিন্তিত তৎপরতা তথা ভোট পেতে যেখানে যেটা প্রয়োজন সেটাই করছে, অর্থ ঢালছে; প্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসেবে বিএনপি কী সেটি ধরতে পারছে? এটা ঠিক, বিএনপির জনপ্রিয়তা ব্যাপক। মানুষও বিএনপিকে ভোট দেয়ার জন্য মুখিয়ে রয়েছে। কিন্তু শহর থেকে গ্রামাঞ্চলের আর্থিকভাবে দুর্বল এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোর ভোট ধানের শীষের ঘরে তুলতে বিএনপি কী কোনো কার্যকর সুচিন্তিত পদক্ষেপ নিচ্ছে? নাকি জনগণ ভোট বিএনপিকে দেবেই এই চিন্তা নিয়ে ঘরে বসে থাকলেই জনগণ বাধ্য হয়েই বিএনপিকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় পাঠাবে? প্রবাসী ভোটারদের পোস্টাল ব্যালটের প্যাকেট বিদেশে জামায়াত নেতার বাসায় আবিষ্কারের পর হইচই হয়েছে। বিএনপি নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করেছে। কিন্তু অভিযোগ করে লাভ কী কিছু হয়েছে? প্রতিপক্ষ যখন যেখানে যা প্রয়োজন সেটার জোগান দিয়ে কর্মকর্তাদের নিজেদের অনুকূলে নিচ্ছে, সেখানে অভিযোগ দিলে কিছু কী হবে? বিএনপিকে তো প্রতিপক্ষ দলের মতোই যাকে যা প্রয়োজন সেটা করতে হবে।
এটি ঠিক, তারেক রহমান দেশে ফিরে আসার পর গণসংবর্ধনায় তার সুপরিকল্পিত বক্তব্য মানুষ দারুণভাবে গ্রহণ করেছে। পরবর্তীতে তার সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং কর্মতৎপরতা উদ্দীপক। নির্বাচনী প্রচারণায় তারেক রহমান যেখানে যাচ্ছেন লাখ লাখ লোক সমবেত হচ্ছেন। এমনকি সারারাত জেগে থেকে মানুষ তারেক রহমানের বক্তব্য শুনছেন। তারেক রহমানও মানুষের মনের কথাই বলছেন। পারিবারিক কার্ড, কৃষক কার্ডসহ তার আগামীর পরিকল্পনা মানুষ গোগ্রাসে গিলছেন; জনসমর্থন পাচ্ছেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মতোই তার চিন্তা-চেতনা, কর্মপরিকল্পনা মানুষ গ্রহণ করছেন। কিন্তু তিনি কী কবির ‘দশে মিলে করি কাজ, হারি-জিতি নাহি লাজ’ মর্মবাণী ভুলে গেছেন? শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নির্বাচনী সফরে গেলে মঞ্চে তার দুই পাশের চেয়ারে সিনিয়র নেতারা শোভাবর্ধন করতেন। বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচনী সফরে গেলে মঞ্চের তার চেয়ারের দুই পাশে সিনিয়রদের জায়গা নির্ধারিত ছিল। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার ডানে-বামে যারা বসতেন তারাও ছিলেন দেশের এবং বিএনপির একেকটি রাজনৈতিক পিলার। জনগণ দেখতেন তাদের নেতাদের পাশে বটবৃক্ষ নেতারা বসে আছেন। ওই বটবৃক্ষ নেতাদের আলোয় প্রধান নেতার নেতৃত্বের ক্যারিশমাটিক আলো আরো ছড়াত। প্রশ্ন হচ্ছে এবার তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রচারণায় মঞ্চে দলের রাজনৈতিক পিলারগুলোর জায়গা নেই? প্রবাদে রয়েছেÑ ‘বন্যেরা বনেই সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’। সারা দেশের অনেকেই ফোন করে আমার কাছে জানতে চায়, ‘ভাই তারেক রহমানের সঙ্গে বিএনপির সিনিয়র নেতারা নেই কেন? যাদের তার দুই পাশের চেয়ার ও পেছনের চেয়ারে দেখা যায়, তারা কারা?
রাজনীতি এখন আর আগের মতো নেই। অতীতে বিএনপিকে ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ফাইট দিতে হয়েছে। সে আওয়ামী লীগের পেছনে ভারত থাকলেও সব কিছুই ছিল প্রকাশ্য। কিন্তু এবার বিএনপিকে ফাইট করতে হচ্ছে জামায়াতের বিরুদ্ধে। এই জামায়াত কারা? আওয়ামী লীগের শাসনামলে সিনিয়র কয়েকজন নেতার ফাঁসির বিরুদ্ধে জামায়াত রাজপথে সোচ্চার থাকলেও ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগেই দলটি গুপ্ত রাজনীতিতে চলে যায়। বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে যখন আওয়ামী লীগ স্ট্রিম রোলার চালিয়েছে, তখন জামায়াতকে মাঠে দেখা যায়নি; বরং কমিউনিস্টদের মতো জামায়াত কৌঁসুলি রাজনীতির নামে আওয়ামী লীগে গেছে। ছাত্রশিবির গুপ্ত রাজনীতির কৌশল নিয়ে ছাত্রলীগের ভেতরে থেকে হেলমেট ও লাঠিয়াল বাহিনীর ভূমিকা পালন করেছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত জামায়াত নেতারা স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা ও প্রভাবশালীদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করেছে। পাশাপাশি জামায়াত স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ব্যবসাসহ নিজস্ব ব্যবসাগুলোর কলেবর বাড়িয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রকাশ পায় জামায়াত ও শিবির এতদিন রং বদল করে গুপ্ত রাজনীতি করেছে। শুধু কী তাই? অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর শিবিরের গুপ্ত নেতাদের অনেকেই এনসিপি গঠন করে এবং তাদের সহায়তায় জামায়াত প্রশাসনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। এ ছাড়াও এবারের নির্বাচনের উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ প্রভাবশালী দেশগুলো সরাসরি নজর রাখছে। ঢাকায় কর্মরত বিদেশি কূটনীতিকদের দৌড়ঝাঁপ দেখলে সেটি বোঝা যায়। আবার একাধিক শক্তিশালী মুসলিম দেশ এবার জামায়াতকে আর্থিক সহায়তাসহ বুদ্ধি-পরামর্শ দিচ্ছে। সেই জামায়াতকে নির্বাচনে মোকাবিলা করতে হচ্ছে বিএনপিকে। বিএনপির বাইরের কোনো শক্তি তেমন নেই; দেশের ভোটারই হচ্ছে বিএনপির শক্তি। কাজেই বিএনপিকে তো চোখ-কান খোলা রেখে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে হবে।
ঈশপের গল্প ‘কচ্ছপ আর খরগোশের দৌড় প্রতিযোগিতার কাহিনী’ আমাদের জানা। চলমান বাস্তবতায় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিকে খরগোশ আর জামায়াতকে কচ্ছপের সঙ্গে তুলনা করা চলে। খরগোশ-কচ্ছপের দৌড় প্রতিযোগিতার কাহিনী এবং বিএনপি-জামায়াতের নির্বাচনী কৌশল-প্রচারণা সবার জানা। দীর্ঘ ১৮ বছর জুলুম-নির্যাতনের শিকার আকাশছোঁয়া জনপ্রিয় বিএনপি আচরণে নির্বাচনী মাঠে যেন খরগোশের মতোই হয়ে গেছে। ৪০ বছর ধরে ইনকিলাবের সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। মাদরাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের সংগঠন জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের সভাপতি হিসেবে কাজ করছি অনেক বছর ধরে। পেশাগত কারণে ঢাকায় কর্মরত বিদেশি অনেক কূটনীতিকের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। তাদের সঙ্গে সবসময় উঠাবসা আছে। সম্পাদক এবং বৃহৎ অরাজনৈতিক সংগঠন মোদার্রেছীনের সভাপতি হিসেবে সারা দেশের মানুষের সঙ্গে আমার সর্বদা যোগাযোগ। মাদরাসার শিক্ষক-ছাত্রের পাশাপাশি সারা দেশের কৃষক-শ্রমিক থেকে শুরু করে দল-মত নির্বিশেষে সব শ্রেণিপেশার মানুষ এবং আলেম-ওলামা, দরবার-দরগা, ইসলামী স্কলার, পীর-মাশায়েখের সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ ও সম্পর্ক-কথাবার্তা হয়। সে সুবাদে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী প্রচারণা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলগুলোর সব ধরনের কর্মকাণ্ডের খোঁজখবর পাই। বিভিন্ন মানুষের দেয়া তথ্যে জানতে পারি, নির্বাচনে বিজয়ী হতে জামায়াত কিভাবে সর্বাত্মক চতুর্মুখী প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ইসলামী ধারার দল অথচ হিন্দুদের ভোট পেতে দলের হিন্দু শাখা খুলেছে। পূজাম-পে গিয়ে গিতা পাঠ করেছে। মুসলমানের রোজা ও হিন্দুদের পূজা একই বৃন্তের দুই ফুল তথা রোজা ও পূজা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ বক্তব্য দিয়েছে। দেশের অর্ধেক ভোটার নারী, তারপরও শিক্ষিত কর্মজীবী নারীদের ঘরে রাখা এবং নারীদের অফিস-আদালতের কাজে নিরুৎসাহিত করার ম্যাসেজ দিচ্ছে। আবার দলটি নারী সদস্যদের ঘরে ঘরে পাঠাচ্ছে সাধারণ ধর্মভীরু গৃহিণীদের নিজেদের দিকে টানছে। জামায়াতকে ভোট দিলে জান্নাতের টিকিট বক্তব্য তো অনেক আগেই ভাইরাল হয়েছে। নির্বাচনে বিজয়ী হতে দলটির প্রার্থী ও নেতাদের উঠান বৈঠক, মহিলা নেত্রীদের ঘরে ঘরে উঠান বৈঠক, ধর্মীয় দুর্বলতা উসকে দিয়ে গৃহিণীদের মগজ ধোলাই করছে। নানাভাবে আর্থিকভাবে দুর্বল নারীদের আর্থিক সহায়তা, এটা-সেটা উপহার, জায়নামাজ, তসবিহ উপহার দিচ্ছে। গরিব কৃষক-শ্রমিক থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটারদের আইডি কার্ডের নম্বর এবং বিকাশ নম্বর নিচ্ছে। অনেক ভোটারকে আর্থিক সহায়তা করছে এবং নির্বাচনের আগে আরো সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। শুধু আমিই পাচ্ছি না, এসব খবর গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিদিন প্রকাশ পাচ্ছে। কিছু এলাকায় বিএনপি কর্মীরা প্রতিবাদও করছেন। শুধু কী তাই, বিদেশে প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালটের প্যাকেট জামায়াত নেতাদের বাসায় পাওয়া, দেশের বিভিন্ন আসনের ভোটারের এলাকা পরিবর্তন করিয়ে বিশেষ আসনে ভোটার করা এগুলো এখন লুকোছাপা নেই। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এসব খবর এখন ওপেন-সিক্রেট। নির্বাচনে বিজয়ী হতে জামায়াতের মহাকর্মযজ্ঞ ঠেকানো এবং কর্মযজ্ঞের বিপরীতে বিএনপি কী পদক্ষেপ নিচ্ছে? বিএনপির নীতি নির্ধারকদের বাংলাদেশের মানুষ তথা নিম্নবিত্ত মানুষের আর্থিক দুর্বলতা ও মনন বুঝতে হবে। গ্রামের এবং মফস্বল শহর ও রাজধানী ঢাকার বস্তিতে বসবাস করা নিম্নআয়ের মানুষকে যারা পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেবেন, গরিব মানুষ তো তাকেই ভোট দেবে। প্রতিপক্ষ দলের বিকাশে ভোটারদের টাকা পাঠানোর সংস্কৃতি ঠেকাতে এবং এর বিপরীতে বিএনপি কী পদক্ষেপ নিচ্ছে? বিএনপির নীতি-নির্ধারকদের ভাবতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ার বদৌলতে এটিও ওপেন-সিক্রেট, বিএনপির ভেতরেও গুপ্ত জামায়াত-শিবির সক্রিয়। কট্টর বিএনপি হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের কেউ কেউ দিনে বিএনপির কড়া সমর্থক ও নেতা হিসেবে পরিচয় দিলেও রাতের আধারে জামায়াতের হয়ে কাজ করছেন। বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা কী গুপ্তদের চিহ্নিত করে সতর্কতা অবলম্বন করতে পারছেন? ভেনিজুয়েলার কমিউনিস্ট নেতা হুগো শ্যাভেজের সাহসীকতা কে না জানে? তার অনুসারী নিকোলাস মাদুরোও সাহসী ছিলেন এবং রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার নিরাপত্তাবলয় ছিল দুর্ভেদ্য। মার্কিন বাহিনী সেটিকে ভেদ করে নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে গেছে অনায়াসে। মাদুরোর নিরাপত্তায় নিয়োজিতরাই মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে মাদুরো ও তার স্ত্রীকে মার্কিন বাহিনীকে তুলে নিয়ে যেতে সহায়তা করেছে। দলের ভেতরে গুপ্তদের সম্পর্কে কী বিএনপির নীতি-নির্ধারকরা সতর্ক আছেন? মহাখালীর গাউসুল আজম মসজিদ প্রাঙ্গণে অফিসে নিয়মিত বসি। সেখানে অনেকে আসা-যাওয়া করেন। কিছু দিন আগে বনানীর কড়াইল বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের বিভিন্ন জনের সহায়তার খবর পেলাম। মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশ থেকে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দেয়া হয়েছে। শুনলাম, জামায়াত নেতাদের দিয়ে যেসব ত্রাণ প্যাকেট বিতরণ করা হয়, সেটি ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসী ইনটেক পেয়েছেন। আর যেটি বিএনপির স্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে দেয়া হয়, তার বেশির ভাগ প্যাকেটই ছিল কাটাছেঁড়া। বস্তিবাসীদের মধ্যে এ নিয়ে নানান কথা চালাচালি হয়েছে। শুধু কী তাই! শুনেছি ঢাকা-১৭ আসনে তারেক রহমানকে পরাজিত করতে জামায়াত মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী ডা. খালেদুজ্জামান ভোটারদের ঘরে ঘরে যাচ্ছেন এবং বিপুল অর্থ ব্যয় করছেন। ওই আসনের বিপুল সংখ্যক ভোটার বস্তির বাসিন্দা। আর্থিকভাবে দুর্বল বস্তিবাসীদের জামায়াত নানাভাবে আথিক সহায়তা করছে। অথচ বিএনপি প্রার্থী তারেক রহমানের পক্ষে তেমন কিছুই করা হচ্ছে না। আর্থিকভাবে দুর্বল বস্তিবাসীদের ভোট টাকার বিনিময়ে প্রতিপক্ষের বাক্সে যাওয়া ঠেকানোর কী কোনো উদ্যোগ বিএনপি চেয়ারম্যানের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা নিয়েছেন? যে যাই বলুক আমার ব্যক্তিগত ধারণা তারেক রহমান দুটি আসনেই বিজয়ী হবেন। কিন্তু বগুড়ার আসনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হলেও ঢাকার আসনে কী বিপুল ভোটে বিজয়ী হতে পারবেন? বাস্তবতা হলো তারেক রহমান লন্ডন থেকে ফিরে যে আলোড়ন তুলেছেন এবং আগামীর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন, তাতে ঢাকার আসনেও বিরাট বিজয় হওয়া আবশ্যক। জামায়াত যে দর্শনে নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছে এবং ভোটারদের পেছনে অর্থ ঢালছে, বিএনপিকেও সেই দর্শনে যেতে হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইতোমধ্যেই নির্বাচন নিয়ে নানান বক্তব্য দিচ্ছেন-মন্তব্য করছেন। তারা বলছেন, প্রধান উপদেষ্টা নিজেই বলেছেন, তরুণরা বিজয়ী হবে তাদের কেউ কেউ মন্ত্রী হবে। তিনি এমন বক্তব্য দেন কেমন করে? অনেকেই মনে করছেন, নির্বাচন নিয়ে ম্যাটিকুলাস ডিজাইন রয়েছে। একটি জরিপে দেখানো হয়েছে বিগত দিনে ১০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জামায়াত ৩০টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। ওই সব আসনে এবার দলীয় ভোটারদের অন্য আসন থেকে স্থানান্তর করা হয়েছে। তলে তলে জামায়াতকে বিজয়ী করতে গোপন প্লান হচ্ছে। এমনকি বিএনপির বেখেয়ালিতে তারা সফল হলে ঢাকার আসনে তারেক রহমানকে পরাজিত করা হতে পারে। কাজেই বিএনপিকে সব দিকে খেয়াল রাখতে হবে। মনের রাখতে হবে, ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগ নির্বাচনের আগে মন্ত্রিসভার তালিকা তৈরি করেছিল। কিন্তু নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়েছিল।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে বিএনপির ভুল করার সুযোগ নেই। জনসমর্থনের দিক দিয়ে বিএনপির চেয়ে জামায়াত যোজন যোজন মাইল পেছনে থাকলেও জামায়াত ক্যাডার-ভিত্তিক সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল। দলটির শীর্ষ নেতা যে নির্দেশনা দেবেন, তা অন্য নেতারা অক্ষরে অক্ষরে কার্যকর করেন। অন্যদিকে, বিএনপির ব্যাপক জনসমর্থন ও নেতারা পরীক্ষিত হলেও দল হিসেবে এখনো সুসংগঠিত নয়। যদিও দীর্ঘ ১৮ বছর দলটির নেতাকর্মীরা নানা জুলুম-নির্যাতন, হামলা-মামলা সহ্য করেছেন এবং মন্ত্রী-এমপি হওয়ার প্রলোভন প্রত্যাখ্যান করে দাঁত কামড়ে মাঠে থেকেছেন। শত শত মামলা-হামলা ও গুন-খুন করেও বিএনপির নেতাদের বাগে নিতে পারেনি আওয়ামী লীগ। বিএনপির নেতারা যে পরীক্ষিত এবং দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তারপরও বলতে হয় জামায়াত অনেক আগে প্রার্থী ঘোষণা করলেও জোটের শরিকদের আসন ছেড়ে দেয়ার পর দলটির প্রার্থীরা দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। কিন্তু বিএনপির চিত্র ভিন্ন। শরিক দলগুলোকে আসন ছেড়ে দেয়ার পর কেন্দ্রের নির্দেশ অমান্য করে অনেক বিএনপি নেতা বিদ্রোহী হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনী মাঠে রয়ে গেছেন। গণমাধ্যমের খবর হলো এখন পর্যন্ত ৭৯ আসনে বিএনপি নেতারা স্বতন্ত্র ও বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়ে গেছেন। ৪৬ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের চাপে বিএনপি ও মিত্র দলের প্রার্থীরা। যা শরিক দলগুলোর প্রার্থীদের জন্য বেদনার কারণ হয়ে গেছে। শরিক দলগুলোর প্রার্থীরা পরাজিত হলে সে দায় তো বিএনপির ঘাড়ে যাবে। ওই সব আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে ভোট ভাগাভাগি হলে প্রতিপক্ষ জামায়াতের প্রার্থীরা এগিয়ে যাবে। বিএনপির উচিত কেন্দ্রীয়ভাবে শরিক দলগুলোর প্রার্থীদের পাশে দাঁড়ানো। প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় সিনিয়র নেতা ও মিত্র দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে বসে আলোচনা করে সবাইকে বিজয়ী করার পথ বের করতে হবে। এখানে আরেকটি কথা না বললেই নয়; বিএনপির বিরুদ্ধে জামায়াত ও তার ‘বট’ বাহিনী যেভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে বিএনপিকে একাই লড়তে হচ্ছে। মিত্র দলগুলোর সিনিয়র নেতারা মনোকষ্টের কারণে নীরব। বিএনপির সিনিয়র নেতাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মিত্র দলের প্রার্থীদের বিজয়ী করতে আনতে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনী মাঠে নামলে মিত্র দলগুলোও বিএনপির বিরুদ্ধে জামায়াতের অপপ্রচারের জবাব দেবে। চারদিক থেকে জামায়াতের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠলে দলটি ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে পারবে না। পাশাপাশি দলের নির্দেশ অমান্য করে নির্বাচনের মাঠে থাকা বিদ্রোহী প্রার্থীরা কোণঠাসা হয়ে যাবে।
বড় দল আর বিপুল জনসমর্থন থাকলেই হবে না, নির্বাচনে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে বিজয়ী হতে গেলে কৌশল ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত অপরিহার্য। ইতিহাস শিক্ষা দেয় ১৯৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে তিন হাজার সৈন্য নিয়ে ইংরেজরা নবাব সিরাজ উদদৌলার ৫০ হাজার সৈন্যকে পরাজিত করেছিল শুধু কৌশলগত ভুলের কারণে। বিপুল জনসমর্থিত দল বিএনপি নেতাদের সেটি মাথায় রেখেই নির্বাচনী মাঠে থাকতে হবে।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নির্বাচনী কৌশল এবং তার সংস্পর্শে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। তবে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নির্বাচনী কৌশল দেখার সুযোগ হয়েছে। তিনি আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। ওই সময় বয়স কম হলেও তিনি যে নানা বিষয়ে জানতে চানতি এবং পরামর্শ দেননি এমন নয়। রাজনীতিতে অত্যন্ত দক্ষ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতি এবং নির্বাচনী প্রচারণায় দলের সিনিয়র নেতাদের পাশে রাখতেন। পরীক্ষিত ও সিনিয়র নেতাদের তত্ত্বাবধানে তিনি থাকতেন। এখন অপ্রিয় হলেও শুনতে হচ্ছে, সিনিয়র নেতাদের অনেকেই বিএনপির গুলশান অফিসে যেতে বিব্রতবোধ করেন। এটি হবে কেন?
এটি ঠিক স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এবং এনজিও থাকায় আর্থিকভাবে জামায়াত অনেক স্বাবলম্বী। গণমাধ্যমের খবরে দেখেছি, প্রায় পৌনে দুই শ’ আসন ‘এ’ গ্রেড ধরে ওই সব আসনে বিজয়ী হতে জামায়াত বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। ভোটারদের ভোট পেতে যেখানে যেভাবে অর্থ খরচ করতে হয়, সেভাবেই দুহাতে খরচ করছে। এ ক্ষেত্রে দল হিসেবে বিএনপি আর্থিকভাবে দুর্বল। তবে এটি অস্বীকার করার উপায় নেই, বিএনপিতে অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তি রয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকার আর্থিক খাতকে লেজেগোবরে করায় ব্যবসায়ীরা বিপর্যস্ত। তারাও নতুন সরকারের অপেক্ষায় রয়েছেন। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব যদি বিশেষ বিশেষ ব্যবসায়ী নেতা ও ব্যবসায়ীদের ব্যবহার করে দলীয় প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণায় আর্থিক সাপোর্টের ব্যবস্থা করেন, তাহলে অনেক ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি নিজেদের প্রয়োজনেই বিএনপি প্রার্থীদের পেছনে অর্থ ব্যয় করবেন এটি আমার বিশ্বাস। তারেক রহমান নিজেই বলেছেন, ‘যতই শক্তিশালী হোন না কেন, প্রতিপক্ষকে কখনোই দুর্বল ভাবা উচিত নয়’। বিএনপির নেতাদের এই উপলব্ধিকে কাজে লাগাতে হবে। তারেক রহমান সারাদেশ সফর করছেন; অথচ তার পাশের চেয়ারগুলোতে সিনিয়র নেতাদের দেখা যাচ্ছে খুব কম। তারেক রহমানের উত্তরাঞ্চল সফরে প্রতিটি সমাবেশে লাখো লোকের সমাবেশ ঘটেছে। কিন্তু ওই অঞ্চলের বিএনপির প্রতি দুর্বল এমন অনেকেই ফোন করে আমার কাছে জানতে চেয়েছেন, ওই সব সমাবেশে মঞ্চে তারেক রহমানের পাশে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে দেখা যায়নি কেন? ওই এলাকায় এ দুজন নেতা খুবই জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ধরা হয়। অন্যান্য এলাকার সমাবেশেও দলের পিলার হিসেবে পরিচিত সিনিয়র নেতা তথা স্থানীয় কমিটির সদস্যদের দেখা না যাওয়া নিয়ে জানতে চেয়েছেন অনেকেই। উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতিক হিসেবে তারেক রহমান দেশের ডান-বাম-মধ্যপন্থি এবং অতি ডান অতি বামপন্থি সবার কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য নেতা। তার সমপর্যায়ের এবং বিকল্প নেতা এ মুহূর্তে নেই। দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরে তারেক রহমান সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ঐতিহাসিক বক্তব্য দিয়ে সবার মন জয় করেছেন। তার ৩১ দফা কর্মসূচি এবং ‘উই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান ফর দ্য পিপল, ফর দ্য কান্ট্রি’ পরিকল্পনা মানুষের মনে নাড়া দিয়েছে। তারেক রহমান একাই এক শ’। কিন্তু সভা-সমাবেশে মঞ্চে তার পাশের চেয়ারে যদি বিএনপির পিলার হিসেবে পরিচিত সিনিয়র নেতারা বসেন তাহলে তার নেতৃত্বের উজ্জ্বলতা ও শক্তি আরো কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। শুধু তাই নয়, ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতা গ্রহণ করে জাতিকে নানা স্বপ্ন দেখালেও তিনি এবং তার উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সমালোচনা করা ছাড়া কোনো সেক্টরেই কোনো আশা জাগাতে পারেননি। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, অন্তর্বর্তী সরকার দেশের পঙ্গু অর্থনীতিকে ঢেলে সাজানো এবং অর্থনীতির চাকা গতিশীল করতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। ফলে নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় গেলেও নতুন সরকারকে চরম আর্থিক দুরবস্থা মোকাবিলা করতে হবে। সে জন্য হলেও দলটির উচিত অতি দ্রুত দলের নীতি-নির্ধারণী পরিষদ, সিনিয়র নেতা, মিত্র দলগুলোর নেতাদের নিয়ে বৈঠক করে নির্বাচনী কর্মপন্থাকে এগিয়ে নেয়া। সভা-সমাবেশে লাখো জনতার স্রোত নির্বাচনে বিজয়ী হতে আশার আলো জাগায়; কিন্তু গভীর মনোযোগ দিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে আগামীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা বিএনপির জন্য জরুরি। বিশেষ করে সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করলে তাদের অভিজ্ঞতা এবং সুচিন্তিত মতামত নিয়ে নির্বাচনী পরিকল্পনা সাজানো গেল প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত যতই প্রচারণা করুক; বিএনপির প্রত্যাশিত বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না। আগেই বলেছি; ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির পরাজিত হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু জামায়াতের মতো শক্তিকে দুর্বল ভেবে ভুল করারও সুযোগ নেই। বিএনপিকে বুঝতে হবে দিস টাইম অর নেভার (এবারই সময়, নইলে কখনোই নয়)।
কথায় আছে ‘নিজে যতই শক্তিশালী হোন না কেন, প্রতিপক্ষকে কখনোই দুর্বল ভাবা উচিত নয়। প্রতিপক্ষকে ছোট করে দেখা নিজের পরাজয়ের কারণ হতে পারে।’ গত ৩১ জানুয়ারি বগুড়ার এক নির্বাচনী সভায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এবারের নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বসে থাকলে চলবে না, সবার কাছেই যেতে হবে। জনবিচ্ছিন্ন হয়ে জয়ের আশা করা যাবে না।’ তারেক রহমানের এই উপলব্ধি যথার্থ। এই উপলব্ধির আলোকে তার নির্বাচনী ফ্রেমওয়ার্ক সাজানো উচিত। এবারের নির্বাচনে বিএনপির ভুল করার সুযোগ নেই। দেশের রাজনীতিতে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল আওয়ামী লীগ। তারা এখন নেই। এবার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে একসময় বিএনপির ছায়ায় দেশের রাজনীতিতে বেড়ে উঠা জামায়াত। বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের পর দেশ-বিদেশে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হিসেবে বিবেচিত ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ সালের নির্বাচনগুলোর সংসদের আসন সংখ্যা ও ভোটের হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জনসমর্থনের দিক দিয়ে বিএনপির অনেক পেছনে জামায়াতের অবস্থান। আবার ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর জামায়াতের ‘অতি বাড়াবাড়ি রকম আওয়াজ’ এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় দলটির ‘বট’ বাহিনীর নিরবচ্ছিন্ন প্রচারণায় মনে হচ্ছে দলটি যেন ক্ষমতায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে; অপেক্ষা শুধু নির্বাচন। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার লক্ষ্যে যা যা করা প্রয়োজন, জামায়াত তাই করছে। নির্বাচন এবং যুদ্ধের ময়দানে বিজয়ী হতে ন্যায়-অন্যায়, নীতি-নৈতিকতা গৌণ। নির্বাচন বা যুদ্ধে বিজয়ী হওয়াই মুখ্য। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও জামায়াত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ী হতে প্রকাশ্যে এবং পর্দার আড়ালে প্রয়োজনীয় সব কিছুই করছে। নির্বাচন যেহেতু পাওয়ার গেম। আদর্শ-দর্শন এখানে অনুপস্থিত। ফলে বিজয়ী হতে হলে প্রকাশ্যে-পর্দার আড়ালে যা করা দরকার, জামায়াত তাই করছে। প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে ভোটারদের অর্থ, কথা যেখানে যা প্রয়োজন সেভাবে নিজেদের পক্ষে টানছে। অন্য যে কেউ জামায়াতের দায়িত্বে থাকলে বর্তমান জামায়াত নেতারা যা করছেন, তাই করত। কিন্তু দেশের সবচেয়ে বৃহৎ এবং জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বিএনপি কী সেটি মোকাবিলার চেষ্টা করছে? নির্বাচনে বিজয়ী হতে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলে জামায়াত যে সুচিন্তিত তৎপরতা তথা ভোট পেতে যেখানে যেটা প্রয়োজন সেটাই করছে, অর্থ ঢালছে; প্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসেবে বিএনপি কী সেটি ধরতে পারছে? এটা ঠিক, বিএনপির জনপ্রিয়তা ব্যাপক। মানুষও বিএনপিকে ভোট দেয়ার জন্য মুখিয়ে রয়েছে। কিন্তু শহর থেকে গ্রামাঞ্চলের আর্থিকভাবে দুর্বল এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোর ভোট ধানের শীষের ঘরে তুলতে বিএনপি কী কোনো কার্যকর সুচিন্তিত পদক্ষেপ নিচ্ছে? নাকি জনগণ ভোট বিএনপিকে দেবেই এই চিন্তা নিয়ে ঘরে বসে থাকলেই জনগণ বাধ্য হয়েই বিএনপিকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় পাঠাবে? প্রবাসী ভোটারদের পোস্টাল ব্যালটের প্যাকেট বিদেশে জামায়াত নেতার বাসায় আবিষ্কারের পর হইচই হয়েছে। বিএনপি নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করেছে। কিন্তু অভিযোগ করে লাভ কী কিছু হয়েছে? প্রতিপক্ষ যখন যেখানে যা প্রয়োজন সেটার জোগান দিয়ে কর্মকর্তাদের নিজেদের অনুকূলে নিচ্ছে, সেখানে অভিযোগ দিলে কিছু কী হবে? বিএনপিকে তো প্রতিপক্ষ দলের মতোই যাকে যা প্রয়োজন সেটা করতে হবে।
এটি ঠিক, তারেক রহমান দেশে ফিরে আসার পর গণসংবর্ধনায় তার সুপরিকল্পিত বক্তব্য মানুষ দারুণভাবে গ্রহণ করেছে। পরবর্তীতে তার সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং কর্মতৎপরতা উদ্দীপক। নির্বাচনী প্রচারণায় তারেক রহমান যেখানে যাচ্ছেন লাখ লাখ লোক সমবেত হচ্ছেন। এমনকি সারারাত জেগে থেকে মানুষ তারেক রহমানের বক্তব্য শুনছেন। তারেক রহমানও মানুষের মনের কথাই বলছেন। পারিবারিক কার্ড, কৃষক কার্ডসহ তার আগামীর পরিকল্পনা মানুষ গোগ্রাসে গিলছেন; জনসমর্থন পাচ্ছেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মতোই তার চিন্তা-চেতনা, কর্মপরিকল্পনা মানুষ গ্রহণ করছেন। কিন্তু তিনি কী কবির ‘দশে মিলে করি কাজ, হারি-জিতি নাহি লাজ’ মর্মবাণী ভুলে গেছেন? শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নির্বাচনী সফরে গেলে মঞ্চে তার দুই পাশের চেয়ারে সিনিয়র নেতারা শোভাবর্ধন করতেন। বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচনী সফরে গেলে মঞ্চের তার চেয়ারের দুই পাশে সিনিয়রদের জায়গা নির্ধারিত ছিল। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার ডানে-বামে যারা বসতেন তারাও ছিলেন দেশের এবং বিএনপির একেকটি রাজনৈতিক পিলার। জনগণ দেখতেন তাদের নেতাদের পাশে বটবৃক্ষ নেতারা বসে আছেন। ওই বটবৃক্ষ নেতাদের আলোয় প্রধান নেতার নেতৃত্বের ক্যারিশমাটিক আলো আরো ছড়াত। প্রশ্ন হচ্ছে এবার তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রচারণায় মঞ্চে দলের রাজনৈতিক পিলারগুলোর জায়গা নেই? প্রবাদে রয়েছেÑ ‘বন্যেরা বনেই সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’। সারা দেশের অনেকেই ফোন করে আমার কাছে জানতে চায়, ‘ভাই তারেক রহমানের সঙ্গে বিএনপির সিনিয়র নেতারা নেই কেন? যাদের তার দুই পাশের চেয়ার ও পেছনের চেয়ারে দেখা যায়, তারা কারা?
রাজনীতি এখন আর আগের মতো নেই। অতীতে বিএনপিকে ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ফাইট দিতে হয়েছে। সে আওয়ামী লীগের পেছনে ভারত থাকলেও সব কিছুই ছিল প্রকাশ্য। কিন্তু এবার বিএনপিকে ফাইট করতে হচ্ছে জামায়াতের বিরুদ্ধে। এই জামায়াত কারা? আওয়ামী লীগের শাসনামলে সিনিয়র কয়েকজন নেতার ফাঁসির বিরুদ্ধে জামায়াত রাজপথে সোচ্চার থাকলেও ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগেই দলটি গুপ্ত রাজনীতিতে চলে যায়। বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে যখন আওয়ামী লীগ স্ট্রিম রোলার চালিয়েছে, তখন জামায়াতকে মাঠে দেখা যায়নি; বরং কমিউনিস্টদের মতো জামায়াত কৌঁসুলি রাজনীতির নামে আওয়ামী লীগে গেছে। ছাত্রশিবির গুপ্ত রাজনীতির কৌশল নিয়ে ছাত্রলীগের ভেতরে থেকে হেলমেট ও লাঠিয়াল বাহিনীর ভূমিকা পালন করেছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত জামায়াত নেতারা স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা ও প্রভাবশালীদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করেছে। পাশাপাশি জামায়াত স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ব্যবসাসহ নিজস্ব ব্যবসাগুলোর কলেবর বাড়িয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রকাশ পায় জামায়াত ও শিবির এতদিন রং বদল করে গুপ্ত রাজনীতি করেছে। শুধু কী তাই? অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর শিবিরের গুপ্ত নেতাদের অনেকেই এনসিপি গঠন করে এবং তাদের সহায়তায় জামায়াত প্রশাসনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। এ ছাড়াও এবারের নির্বাচনের উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ প্রভাবশালী দেশগুলো সরাসরি নজর রাখছে। ঢাকায় কর্মরত বিদেশি কূটনীতিকদের দৌড়ঝাঁপ দেখলে সেটি বোঝা যায়। আবার একাধিক শক্তিশালী মুসলিম দেশ এবার জামায়াতকে আর্থিক সহায়তাসহ বুদ্ধি-পরামর্শ দিচ্ছে। সেই জামায়াতকে নির্বাচনে মোকাবিলা করতে হচ্ছে বিএনপিকে। বিএনপির বাইরের কোনো শক্তি তেমন নেই; দেশের ভোটারই হচ্ছে বিএনপির শক্তি। কাজেই বিএনপিকে তো চোখ-কান খোলা রেখে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে হবে।
ঈশপের গল্প ‘কচ্ছপ আর খরগোশের দৌড় প্রতিযোগিতার কাহিনী’ আমাদের জানা। চলমান বাস্তবতায় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিকে খরগোশ আর জামায়াতকে কচ্ছপের সঙ্গে তুলনা করা চলে। খরগোশ-কচ্ছপের দৌড় প্রতিযোগিতার কাহিনী এবং বিএনপি-জামায়াতের নির্বাচনী কৌশল-প্রচারণা সবার জানা। দীর্ঘ ১৮ বছর জুলুম-নির্যাতনের শিকার আকাশছোঁয়া জনপ্রিয় বিএনপি আচরণে নির্বাচনী মাঠে যেন খরগোশের মতোই হয়ে গেছে। ৪০ বছর ধরে ইনকিলাবের সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। মাদরাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের সংগঠন জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের সভাপতি হিসেবে কাজ করছি অনেক বছর ধরে। পেশাগত কারণে ঢাকায় কর্মরত বিদেশি অনেক কূটনীতিকের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। তাদের সঙ্গে সবসময় উঠাবসা আছে। সম্পাদক এবং বৃহৎ অরাজনৈতিক সংগঠন মোদার্রেছীনের সভাপতি হিসেবে সারা দেশের মানুষের সঙ্গে আমার সর্বদা যোগাযোগ। মাদরাসার শিক্ষক-ছাত্রের পাশাপাশি সারা দেশের কৃষক-শ্রমিক থেকে শুরু করে দল-মত নির্বিশেষে সব শ্রেণিপেশার মানুষ এবং আলেম-ওলামা, দরবার-দরগা, ইসলামী স্কলার, পীর-মাশায়েখের সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ ও সম্পর্ক-কথাবার্তা হয়। সে সুবাদে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী প্রচারণা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলগুলোর সব ধরনের কর্মকাণ্ডের খোঁজখবর পাই। বিভিন্ন মানুষের দেয়া তথ্যে জানতে পারি, নির্বাচনে বিজয়ী হতে জামায়াত কিভাবে সর্বাত্মক চতুর্মুখী প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ইসলামী ধারার দল অথচ হিন্দুদের ভোট পেতে দলের হিন্দু শাখা খুলেছে। পূজাম-পে গিয়ে গিতা পাঠ করেছে। মুসলমানের রোজা ও হিন্দুদের পূজা একই বৃন্তের দুই ফুল তথা রোজা ও পূজা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ বক্তব্য দিয়েছে। দেশের অর্ধেক ভোটার নারী, তারপরও শিক্ষিত কর্মজীবী নারীদের ঘরে রাখা এবং নারীদের অফিস-আদালতের কাজে নিরুৎসাহিত করার ম্যাসেজ দিচ্ছে। আবার দলটি নারী সদস্যদের ঘরে ঘরে পাঠাচ্ছে সাধারণ ধর্মভীরু গৃহিণীদের নিজেদের দিকে টানছে। জামায়াতকে ভোট দিলে জান্নাতের টিকিট বক্তব্য তো অনেক আগেই ভাইরাল হয়েছে। নির্বাচনে বিজয়ী হতে দলটির প্রার্থী ও নেতাদের উঠান বৈঠক, মহিলা নেত্রীদের ঘরে ঘরে উঠান বৈঠক, ধর্মীয় দুর্বলতা উসকে দিয়ে গৃহিণীদের মগজ ধোলাই করছে। নানাভাবে আর্থিকভাবে দুর্বল নারীদের আর্থিক সহায়তা, এটা-সেটা উপহার, জায়নামাজ, তসবিহ উপহার দিচ্ছে। গরিব কৃষক-শ্রমিক থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটারদের আইডি কার্ডের নম্বর এবং বিকাশ নম্বর নিচ্ছে। অনেক ভোটারকে আর্থিক সহায়তা করছে এবং নির্বাচনের আগে আরো সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। শুধু আমিই পাচ্ছি না, এসব খবর গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিদিন প্রকাশ পাচ্ছে। কিছু এলাকায় বিএনপি কর্মীরা প্রতিবাদও করছেন। শুধু কী তাই, বিদেশে প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালটের প্যাকেট জামায়াত নেতাদের বাসায় পাওয়া, দেশের বিভিন্ন আসনের ভোটারের এলাকা পরিবর্তন করিয়ে বিশেষ আসনে ভোটার করা এগুলো এখন লুকোছাপা নেই। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এসব খবর এখন ওপেন-সিক্রেট। নির্বাচনে বিজয়ী হতে জামায়াতের মহাকর্মযজ্ঞ ঠেকানো এবং কর্মযজ্ঞের বিপরীতে বিএনপি কী পদক্ষেপ নিচ্ছে? বিএনপির নীতি নির্ধারকদের বাংলাদেশের মানুষ তথা নিম্নবিত্ত মানুষের আর্থিক দুর্বলতা ও মনন বুঝতে হবে। গ্রামের এবং মফস্বল শহর ও রাজধানী ঢাকার বস্তিতে বসবাস করা নিম্নআয়ের মানুষকে যারা পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেবেন, গরিব মানুষ তো তাকেই ভোট দেবে। প্রতিপক্ষ দলের বিকাশে ভোটারদের টাকা পাঠানোর সংস্কৃতি ঠেকাতে এবং এর বিপরীতে বিএনপি কী পদক্ষেপ নিচ্ছে? বিএনপির নীতি-নির্ধারকদের ভাবতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ার বদৌলতে এটিও ওপেন-সিক্রেট, বিএনপির ভেতরেও গুপ্ত জামায়াত-শিবির সক্রিয়। কট্টর বিএনপি হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের কেউ কেউ দিনে বিএনপির কড়া সমর্থক ও নেতা হিসেবে পরিচয় দিলেও রাতের আধারে জামায়াতের হয়ে কাজ করছেন। বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা কী গুপ্তদের চিহ্নিত করে সতর্কতা অবলম্বন করতে পারছেন? ভেনিজুয়েলার কমিউনিস্ট নেতা হুগো শ্যাভেজের সাহসীকতা কে না জানে? তার অনুসারী নিকোলাস মাদুরোও সাহসী ছিলেন এবং রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার নিরাপত্তাবলয় ছিল দুর্ভেদ্য। মার্কিন বাহিনী সেটিকে ভেদ করে নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে গেছে অনায়াসে। মাদুরোর নিরাপত্তায় নিয়োজিতরাই মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে মাদুরো ও তার স্ত্রীকে মার্কিন বাহিনীকে তুলে নিয়ে যেতে সহায়তা করেছে। দলের ভেতরে গুপ্তদের সম্পর্কে কী বিএনপির নীতি-নির্ধারকরা সতর্ক আছেন? মহাখালীর গাউসুল আজম মসজিদ প্রাঙ্গণে অফিসে নিয়মিত বসি। সেখানে অনেকে আসা-যাওয়া করেন। কিছু দিন আগে বনানীর কড়াইল বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের বিভিন্ন জনের সহায়তার খবর পেলাম। মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশ থেকে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দেয়া হয়েছে। শুনলাম, জামায়াত নেতাদের দিয়ে যেসব ত্রাণ প্যাকেট বিতরণ করা হয়, সেটি ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসী ইনটেক পেয়েছেন। আর যেটি বিএনপির স্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে দেয়া হয়, তার বেশির ভাগ প্যাকেটই ছিল কাটাছেঁড়া। বস্তিবাসীদের মধ্যে এ নিয়ে নানান কথা চালাচালি হয়েছে। শুধু কী তাই! শুনেছি ঢাকা-১৭ আসনে তারেক রহমানকে পরাজিত করতে জামায়াত মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী ডা. খালেদুজ্জামান ভোটারদের ঘরে ঘরে যাচ্ছেন এবং বিপুল অর্থ ব্যয় করছেন। ওই আসনের বিপুল সংখ্যক ভোটার বস্তির বাসিন্দা। আর্থিকভাবে দুর্বল বস্তিবাসীদের জামায়াত নানাভাবে আথিক সহায়তা করছে। অথচ বিএনপি প্রার্থী তারেক রহমানের পক্ষে তেমন কিছুই করা হচ্ছে না। আর্থিকভাবে দুর্বল বস্তিবাসীদের ভোট টাকার বিনিময়ে প্রতিপক্ষের বাক্সে যাওয়া ঠেকানোর কী কোনো উদ্যোগ বিএনপি চেয়ারম্যানের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা নিয়েছেন? যে যাই বলুক আমার ব্যক্তিগত ধারণা তারেক রহমান দুটি আসনেই বিজয়ী হবেন। কিন্তু বগুড়ার আসনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হলেও ঢাকার আসনে কী বিপুল ভোটে বিজয়ী হতে পারবেন? বাস্তবতা হলো তারেক রহমান লন্ডন থেকে ফিরে যে আলোড়ন তুলেছেন এবং আগামীর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন, তাতে ঢাকার আসনেও বিরাট বিজয় হওয়া আবশ্যক। জামায়াত যে দর্শনে নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছে এবং ভোটারদের পেছনে অর্থ ঢালছে, বিএনপিকেও সেই দর্শনে যেতে হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইতোমধ্যেই নির্বাচন নিয়ে নানান বক্তব্য দিচ্ছেন-মন্তব্য করছেন। তারা বলছেন, প্রধান উপদেষ্টা নিজেই বলেছেন, তরুণরা বিজয়ী হবে তাদের কেউ কেউ মন্ত্রী হবে। তিনি এমন বক্তব্য দেন কেমন করে? অনেকেই মনে করছেন, নির্বাচন নিয়ে ম্যাটিকুলাস ডিজাইন রয়েছে। একটি জরিপে দেখানো হয়েছে বিগত দিনে ১০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জামায়াত ৩০টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। ওই সব আসনে এবার দলীয় ভোটারদের অন্য আসন থেকে স্থানান্তর করা হয়েছে। তলে তলে জামায়াতকে বিজয়ী করতে গোপন প্লান হচ্ছে। এমনকি বিএনপির বেখেয়ালিতে তারা সফল হলে ঢাকার আসনে তারেক রহমানকে পরাজিত করা হতে পারে। কাজেই বিএনপিকে সব দিকে খেয়াল রাখতে হবে। মনের রাখতে হবে, ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগ নির্বাচনের আগে মন্ত্রিসভার তালিকা তৈরি করেছিল। কিন্তু নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়েছিল।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে বিএনপির ভুল করার সুযোগ নেই। জনসমর্থনের দিক দিয়ে বিএনপির চেয়ে জামায়াত যোজন যোজন মাইল পেছনে থাকলেও জামায়াত ক্যাডার-ভিত্তিক সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল। দলটির শীর্ষ নেতা যে নির্দেশনা দেবেন, তা অন্য নেতারা অক্ষরে অক্ষরে কার্যকর করেন। অন্যদিকে, বিএনপির ব্যাপক জনসমর্থন ও নেতারা পরীক্ষিত হলেও দল হিসেবে এখনো সুসংগঠিত নয়। যদিও দীর্ঘ ১৮ বছর দলটির নেতাকর্মীরা নানা জুলুম-নির্যাতন, হামলা-মামলা সহ্য করেছেন এবং মন্ত্রী-এমপি হওয়ার প্রলোভন প্রত্যাখ্যান করে দাঁত কামড়ে মাঠে থেকেছেন। শত শত মামলা-হামলা ও গুন-খুন করেও বিএনপির নেতাদের বাগে নিতে পারেনি আওয়ামী লীগ। বিএনপির নেতারা যে পরীক্ষিত এবং দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তারপরও বলতে হয় জামায়াত অনেক আগে প্রার্থী ঘোষণা করলেও জোটের শরিকদের আসন ছেড়ে দেয়ার পর দলটির প্রার্থীরা দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। কিন্তু বিএনপির চিত্র ভিন্ন। শরিক দলগুলোকে আসন ছেড়ে দেয়ার পর কেন্দ্রের নির্দেশ অমান্য করে অনেক বিএনপি নেতা বিদ্রোহী হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনী মাঠে রয়ে গেছেন। গণমাধ্যমের খবর হলো এখন পর্যন্ত ৭৯ আসনে বিএনপি নেতারা স্বতন্ত্র ও বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়ে গেছেন। ৪৬ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের চাপে বিএনপি ও মিত্র দলের প্রার্থীরা। যা শরিক দলগুলোর প্রার্থীদের জন্য বেদনার কারণ হয়ে গেছে। শরিক দলগুলোর প্রার্থীরা পরাজিত হলে সে দায় তো বিএনপির ঘাড়ে যাবে। ওই সব আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে ভোট ভাগাভাগি হলে প্রতিপক্ষ জামায়াতের প্রার্থীরা এগিয়ে যাবে। বিএনপির উচিত কেন্দ্রীয়ভাবে শরিক দলগুলোর প্রার্থীদের পাশে দাঁড়ানো। প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় সিনিয়র নেতা ও মিত্র দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে বসে আলোচনা করে সবাইকে বিজয়ী করার পথ বের করতে হবে। এখানে আরেকটি কথা না বললেই নয়; বিএনপির বিরুদ্ধে জামায়াত ও তার ‘বট’ বাহিনী যেভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে বিএনপিকে একাই লড়তে হচ্ছে। মিত্র দলগুলোর সিনিয়র নেতারা মনোকষ্টের কারণে নীরব। বিএনপির সিনিয়র নেতাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মিত্র দলের প্রার্থীদের বিজয়ী করতে আনতে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনী মাঠে নামলে মিত্র দলগুলোও বিএনপির বিরুদ্ধে জামায়াতের অপপ্রচারের জবাব দেবে। চারদিক থেকে জামায়াতের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠলে দলটি ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে পারবে না। পাশাপাশি দলের নির্দেশ অমান্য করে নির্বাচনের মাঠে থাকা বিদ্রোহী প্রার্থীরা কোণঠাসা হয়ে যাবে।
বড় দল আর বিপুল জনসমর্থন থাকলেই হবে না, নির্বাচনে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে বিজয়ী হতে গেলে কৌশল ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত অপরিহার্য। ইতিহাস শিক্ষা দেয় ১৯৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে তিন হাজার সৈন্য নিয়ে ইংরেজরা নবাব সিরাজ উদদৌলার ৫০ হাজার সৈন্যকে পরাজিত করেছিল শুধু কৌশলগত ভুলের কারণে। বিপুল জনসমর্থিত দল বিএনপি নেতাদের সেটি মাথায় রেখেই নির্বাচনী মাঠে থাকতে হবে।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নির্বাচনী কৌশল এবং তার সংস্পর্শে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। তবে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নির্বাচনী কৌশল দেখার সুযোগ হয়েছে। তিনি আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। ওই সময় বয়স কম হলেও তিনি যে নানা বিষয়ে জানতে চানতি এবং পরামর্শ দেননি এমন নয়। রাজনীতিতে অত্যন্ত দক্ষ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতি এবং নির্বাচনী প্রচারণায় দলের সিনিয়র নেতাদের পাশে রাখতেন। পরীক্ষিত ও সিনিয়র নেতাদের তত্ত্বাবধানে তিনি থাকতেন। এখন অপ্রিয় হলেও শুনতে হচ্ছে, সিনিয়র নেতাদের অনেকেই বিএনপির গুলশান অফিসে যেতে বিব্রতবোধ করেন। এটি হবে কেন?
এটি ঠিক স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এবং এনজিও থাকায় আর্থিকভাবে জামায়াত অনেক স্বাবলম্বী। গণমাধ্যমের খবরে দেখেছি, প্রায় পৌনে দুই শ’ আসন ‘এ’ গ্রেড ধরে ওই সব আসনে বিজয়ী হতে জামায়াত বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। ভোটারদের ভোট পেতে যেখানে যেভাবে অর্থ খরচ করতে হয়, সেভাবেই দুহাতে খরচ করছে। এ ক্ষেত্রে দল হিসেবে বিএনপি আর্থিকভাবে দুর্বল। তবে এটি অস্বীকার করার উপায় নেই, বিএনপিতে অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তি রয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকার আর্থিক খাতকে লেজেগোবরে করায় ব্যবসায়ীরা বিপর্যস্ত। তারাও নতুন সরকারের অপেক্ষায় রয়েছেন। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব যদি বিশেষ বিশেষ ব্যবসায়ী নেতা ও ব্যবসায়ীদের ব্যবহার করে দলীয় প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণায় আর্থিক সাপোর্টের ব্যবস্থা করেন, তাহলে অনেক ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি নিজেদের প্রয়োজনেই বিএনপি প্রার্থীদের পেছনে অর্থ ব্যয় করবেন এটি আমার বিশ্বাস। তারেক রহমান নিজেই বলেছেন, ‘যতই শক্তিশালী হোন না কেন, প্রতিপক্ষকে কখনোই দুর্বল ভাবা উচিত নয়’। বিএনপির নেতাদের এই উপলব্ধিকে কাজে লাগাতে হবে। তারেক রহমান সারাদেশ সফর করছেন; অথচ তার পাশের চেয়ারগুলোতে সিনিয়র নেতাদের দেখা যাচ্ছে খুব কম। তারেক রহমানের উত্তরাঞ্চল সফরে প্রতিটি সমাবেশে লাখো লোকের সমাবেশ ঘটেছে। কিন্তু ওই অঞ্চলের বিএনপির প্রতি দুর্বল এমন অনেকেই ফোন করে আমার কাছে জানতে চেয়েছেন, ওই সব সমাবেশে মঞ্চে তারেক রহমানের পাশে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে দেখা যায়নি কেন? ওই এলাকায় এ দুজন নেতা খুবই জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ধরা হয়। অন্যান্য এলাকার সমাবেশেও দলের পিলার হিসেবে পরিচিত সিনিয়র নেতা তথা স্থানীয় কমিটির সদস্যদের দেখা না যাওয়া নিয়ে জানতে চেয়েছেন অনেকেই। উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতিক হিসেবে তারেক রহমান দেশের ডান-বাম-মধ্যপন্থি এবং অতি ডান অতি বামপন্থি সবার কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য নেতা। তার সমপর্যায়ের এবং বিকল্প নেতা এ মুহূর্তে নেই। দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরে তারেক রহমান সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ঐতিহাসিক বক্তব্য দিয়ে সবার মন জয় করেছেন। তার ৩১ দফা কর্মসূচি এবং ‘উই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান ফর দ্য পিপল, ফর দ্য কান্ট্রি’ পরিকল্পনা মানুষের মনে নাড়া দিয়েছে। তারেক রহমান একাই এক শ’। কিন্তু সভা-সমাবেশে মঞ্চে তার পাশের চেয়ারে যদি বিএনপির পিলার হিসেবে পরিচিত সিনিয়র নেতারা বসেন তাহলে তার নেতৃত্বের উজ্জ্বলতা ও শক্তি আরো কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। শুধু তাই নয়, ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতা গ্রহণ করে জাতিকে নানা স্বপ্ন দেখালেও তিনি এবং তার উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সমালোচনা করা ছাড়া কোনো সেক্টরেই কোনো আশা জাগাতে পারেননি। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, অন্তর্বর্তী সরকার দেশের পঙ্গু অর্থনীতিকে ঢেলে সাজানো এবং অর্থনীতির চাকা গতিশীল করতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। ফলে নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় গেলেও নতুন সরকারকে চরম আর্থিক দুরবস্থা মোকাবিলা করতে হবে। সে জন্য হলেও দলটির উচিত অতি দ্রুত দলের নীতি-নির্ধারণী পরিষদ, সিনিয়র নেতা, মিত্র দলগুলোর নেতাদের নিয়ে বৈঠক করে নির্বাচনী কর্মপন্থাকে এগিয়ে নেয়া। সভা-সমাবেশে লাখো জনতার স্রোত নির্বাচনে বিজয়ী হতে আশার আলো জাগায়; কিন্তু গভীর মনোযোগ দিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে আগামীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা বিএনপির জন্য জরুরি। বিশেষ করে সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করলে তাদের অভিজ্ঞতা এবং সুচিন্তিত মতামত নিয়ে নির্বাচনী পরিকল্পনা সাজানো গেল প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত যতই প্রচারণা করুক; বিএনপির প্রত্যাশিত বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না। আগেই বলেছি; ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির পরাজিত হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু জামায়াতের মতো শক্তিকে দুর্বল ভেবে ভুল করারও সুযোগ নেই। বিএনপিকে বুঝতে হবে দিস টাইম অর নেভার (এবারই সময়, নইলে কখনোই নয়)।












