
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ফের ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। আর্থিক লেনদেন, স্বজনপ্রীতি এবং একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের অনুসারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগে ক্যাম্পাসজুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র অসন্তোষ।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে শুরু হওয়া নিয়োগ কার্যক্রমে যোগ্যতার চেয়ে “রাজনৈতিক পরিচয়” বড় হয়ে উঠেছে। নির্দিষ্ট কিছু প্রার্থীদের নাম আগেই চূড়ান্ত হয়ে যাচ্ছে—এমন অভিযোগ করছেন পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রার্থীরা। কেউ কেউ দাবি করছেন, কয়েকটি বিভাগে ভাইভা বোর্ড বসার আগেই ‘কে নিয়োগ পাবে’ তা ঠিক হয়ে যাচ্ছে।
এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পর বিএনপি–সমর্থিত বিভিন্ন সংগঠনের কর্মচারী নেতারা উপাচার্যের কাছে একটি স্মারকলিপি দেন। সেখানে তাঁরা নির্বাচনকালীন সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের জনবল নিয়োগ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার দাবি জানান। স্মারকলিপির অনুলিপি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই সহ–উপাচার্য ও রেজিস্ট্রারের দপ্তরেও জমা দেওয়া হয়।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, বর্তমান বাস্তবতায় নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। নির্বাচন সামনে রেখে এ সময় নিয়োগ অব্যাহত থাকলে তা প্রভাবমুক্ত থাকবে না এবং একটি বিশেষ গোষ্ঠী সুবিধা পাবে—এমন আশঙ্কা রয়েছে। তাই নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত সব ধরনের নিয়োগ স্থগিত রাখার দাবি জানান তাঁরা।
এই দাবির রেশ কাটতে না কাটতেই ঘটে যায় আরেকটি বিতর্কিত ঘটনা। বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ হবিবুর রহমান হলে নিয়োগ বন্ধের দাবিতে স্বাক্ষরকারী এক কর্মচারীকে কর্মস্থল থেকে উঠিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. মোতাহার হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন।
অভিযোগে বলা হয়, ভুক্তভোগী কর্মচারীর নাম মো. মাসুদুর রহমান। তিনি শহীদ হবিবুর রহমান হলে নিম্নমান সহকারী হিসেবে কর্মরত এবং একই সঙ্গে বিএনপিপন্থী কর্মচারীদের সংগঠন বাংলাদেশ আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় জাতীয়তাবাদী কর্মচারী ফেডারেশনের যুগ্ম-আহ্বায়ক। প্রাধ্যক্ষের লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, আসন্ন নির্বাচন ও গণভোট প্রভাবমুক্ত রাখতে রাবিতে সব পর্যায়ের জনবল নিয়োগ শতভাগ বন্ধ রাখার দাবিতে গত ৭ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত পাঁচজন সহায়ক ও সাধারণ কর্মচারী যৌথ স্বাক্ষরে উপাচার্যের কাছে আবেদন জমা দেন। এর পরদিনই সংশ্লিষ্ট এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে এই ‘উঠিয়ে নেওয়ার চেষ্টা’র ঘটনা ঘটে।
নিয়োগ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরেই এমন ঘটনায় বাড়ছে উদ্বেগ ও ক্ষোভ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, “জুলাই আন্দোলনের পরবর্তী প্রশাসনের কাছ থেকে আমরা আশা করেছিলাম নিয়োগ হবে স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, আগের চিত্রই ফিরে আসছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”
শিক্ষার্থীরাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাদের ভাষায়, শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি মানেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর আঘাত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, “যোগ্য শিক্ষক না এলে আমাদের শিক্ষার মান কীভাবে বাড়বে? বিশ্ববিদ্যালয় কি শুধু দলীয় লোক বসানোর জায়গা হয়ে যাবে?”
উল্লেখ্য, সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সোবহানের সময়ে নিয়োগে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় দীর্ঘ ছয় বছর রাবিতে সব ধরনের নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেই নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর আবার নিয়োগ শুরু হয়। কিন্তু শুরু হতেই একের পর এক বিতর্ক ও অভিযোগ সামনে আসছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নিলে রাবি আবারও বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে। নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো প্রতিষ্ঠানই প্রশ্নের মুখে পড়বে। তারা দ্রুত একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা গঠনের দাবি জানিয়েছেন, যাতে নিয়োগ প্রক্রিয়া হয় সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক।
নিয়োগে দুর্নীতির এই হিড়িক থামাতে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আবারও দেশের অন্যতম বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।










