ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) ও জশনে জুলুস: শরীয়তের আলোকে মূল্যায়ন

ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) ও জশনে জুলুস: শরীয়তের আলোকে মূল্যায়ন

মুসলিম বিশ্বের জন্য ১২ই রবিউল আউয়াল দিনটি এক অনন্য তাৎপর্যময় দিন। কারণ এদিনেই জন্ম নেন মানবতার শ্রেষ্ঠ নেতা, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তাঁর জন্ম ও জীবনী মুসলিম উম্মাহর কাছে রহমত ও কল্যাণের বার্তা। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বহু অঞ্চলে এ দিনকে কেন্দ্র করে পালিত হয় “জশনে জুলুস” বা শোভাযাত্রা। তবে ইসলামী শরীয়তের আলোকে এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

কোরআন ও হাদীসের আলোকে নবীজীর জন্মের তাৎপর্য

আল্লাহ তায়ালা কোরআনে বলেন:

“আর আমি আপনাকে (হে মুহাম্মদ) সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছি।”
— (সূরা আম্বিয়া: ১০৭)

আরও বলেন:

“তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।”
— (সূরা আহযাব: ২১)

রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:

“আমি হচ্ছি ইবরাহিম (আ.) এর দোয়া এবং ঈসা (আ.) এর সুসংবাদ।”
— (মুসনাদে আহমদ: ৪/১২৭)

এগুলো থেকে স্পষ্ট হয়, নবীজীর জন্মদিনকে স্মরণ করা কৃতজ্ঞতা ও ইবাদতের মাধ্যমে করা সুন্নাহসম্মত।

হানাফি মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গি

হানাফি ফিকাহ অনুসারে, নবীজীর জন্মদিবস স্মরণ করা বৈধ, যদি তা শরীয়তের সীমার মধ্যে হয়।

আলেমদের বক্তব্য: ইমাম সুয়ূতি (রহ.) ও ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) উল্লেখ করেছেন—মিলাদ পালন করা নেক আমল হতে পারে, যদি এতে কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ, নবীর জীবনী আলোচনা ও দুআ অন্তর্ভুক্ত থাকে।

শর্ত: হানাফি আলেমরা বলেন, এ আয়োজনে হারাম বা বিদআত সন্নিবেশিত হলে তা নিন্দনীয় হবে। কিন্তু যদি এতে ইলম, দাওয়াত ও নবীপ্রেমের প্রকাশ হয়, তবে এটি ইসলামী দৃষ্টিতে জায়েজ।

প্রাধান্য: হানাফি মাযহাবে মিলাদুন্নবী স্মরণের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং নবীজীর প্রতি ভালবাসা প্রদর্শন করা।

জশনে জুলুস: হানাফি মাযহাব কী বলে?

গ্রহণযোগ্য দিক: যদি জশনে জুলুসে কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ-সালাম, ইসলামী নাশিদ, বক্তৃতা, দুআ এবং শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা থাকে, তবে হানাফি আলেমরা এটিকে মুবাহ (অনুমোদিত) বা মুস্তাহাব মনে করেন।

অগ্রহণযোগ্য দিক: তবে বাদ্যযন্ত্র, আতশবাজি, মিশ্রণ, জনদুর্ভোগ সৃষ্টি, অশ্লীলতা—এসবকে হানাফি আলেমরা কড়া ভাষায় নিন্দা করেছেন। কারণ এগুলো শরীয়তের সীমা লঙ্ঘন।

ফতোয়া শামিয়া (হানাফি ফিকাহের গ্রন্থ) অনুযায়ী—

“যে আমল নবীর জীবনীকে প্রচার করে, কোরআন তিলাওয়াত ও দরুদে উৎসাহিত করে, তা সওয়াবের কারণ হবে। তবে তাতে যদি হারাম কাজ যুক্ত হয়, তবে তা বর্জনীয়।”
— (রাদ্দুল মুহতার, ৯/৫৮০)

সারমর্ম

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) মুসলিম উম্মাহর জন্য আনন্দ, কৃতজ্ঞতা ও আত্মশুদ্ধির দিন। হানাফি মাযহাবের আলোকে মিলাদ ও জশনে জুলুস বৈধ হতে পারে—যদি তা ইবাদত, শিক্ষা ও নবীপ্রেম প্রকাশের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ থাকে। তবে এতে শরীয়তবিরোধী কর্মকাণ্ড যুক্ত হলে তা সম্পূর্ণ বর্জনীয়।

অতএব, এ দিনের আসল তাৎপর্য হলো বাহ্যিক শোভাযাত্রা নয়, বরং নবীজীর আদর্শকে জীবনে বাস্তবায়ন করা—যাতে সমাজে দয়া, ন্যায়, সত্য ও মানবতার আলো ছড়িয়ে পড়ে।

রিপোর্ট: মোহাম্মদ ইউছুপ

নিয়ে আরো পড়ুন