
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে মানিকগঞ্জের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন দুই প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরি। দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত রাজনৈতিক ঐতিহ্য, ব্যক্তিগত সততা ও তৃণমূলের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ককে পুঁজি করে তারা ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন।
নির্বাচনি মাঠে এই দুই প্রার্থীর উপস্থিতি মানিকগঞ্জের ভোটের সমীকরণে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।
মানিকগঞ্জ-৩ (সদর-সাটুরিয়া) আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আফরোজা খানম রিতা এবং মানিকগঞ্জ-২ (সিংগাইর-হরিরামপুর ও সদরের একাংশ) আসনে সাবেক এমপি ইঞ্জিনিয়ার মইনুল ইসলাম খান শান্ত এই দুই প্রার্থীই নিজ নিজ পিতার রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তরাধিকার বহন করছেন।
আফরোজা খানম রিতা দেশের অন্যতম সফল শিল্প উদ্যোক্তা, সাবেক মন্ত্রী ও একাধিকবারের নির্বাচিত এমপি হারুনর রশীদ খান মুন্নুর কন্যা। মুন্নু সিরামিকের মাধ্যমে তার পিতা যেমন দেশের শিল্পখাতে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিলেন, তেমনি রিতা সেই উত্তরাধিকার ধরে রেখে ব্যবসা ও রাজনীতিতে নিজস্ব গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছেন। শিক্ষা জীবনেও তিনি ছিলেন মেধাবী ও কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের অধিকারী।
রাজনৈতিক অঙ্গনে আফরোজা খানম রিতা দীর্ঘদিন জেলা বিএনপির সভাপতি এবং পরে আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কঠিন সময়েও দলকে সংগঠিত রাখতে তার ভূমিকা ছিল দৃশ্যমান। বিশেষ করে বিগত সরকারের সময়ে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা যখন মামলা, গ্রেফতার ও নির্যাতনের শিকার হন, তখন নিজস্ব অর্থায়নে আইনি সহায়তা, পারিবারিক ভরণপোষণ ও সাংগঠনিক সহায়তা দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। এসব কারণে দলীয় হাইকমান্ড থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত তার প্রতি আস্থার জায়গাটি শক্ত হয়েছে।
জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট জিএস জিন্নাহ খান জানালেন, যে সময় সবাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, তখন রিতা আপা আমাদের হাত ধরেছেন। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই এবার আমরা একাট্টা। তিনি শুধু আইনি সেবা সহায়তা করেই তার দায়িত্ব শেষ করেননি। দলের তৃণমূলের কোনো নেতাকর্মী পুলিশি জেল-জুলুম নির্যাতনের শিকার হলে তিনি ওই কর্মীর পরিবারকে অর্থ সহায়তা দিতে যা রাজনীতির ইতিহাসে অনন্য নজির।
অন্যদিকে মানিকগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মইনুল ইসলাম খান শান্ত সাবেক মন্ত্রী ও একাধিকবারের নির্বাচিত এমপি শামসুল ইসলাম খানের (নয়া মিয়া) পুত্র। রাজনীতির পাশাপাশি একসময় সফল ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত নয়া মিয়ার আদর্শেই বেড়ে ওঠা শান্ত রাজনীতিতে এসেছেন পরিকল্পিতভাবে। তিনি নিজেও সাবেক এমপি এবং বর্তমানে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা।
মইনুল ইসলাম খান শান্ত বলেন, বাবা শুধু রাজনীতি শেখাননি, মানুষের জন্য কাজ করার শিক্ষা দিয়েছেন। সেই শিক্ষা নিয়েই আমি রাজনীতিতে আছি।
স্থানীয় অভিজ্ঞ রাজনৈতিক বা নির্বাচনী নীতি মতে, দুই প্রার্থীই পারিবারিক পরিচয়ের বাইরে নিজেদের ক্লিন ইমেজ ও সাংগঠনিক দক্ষতার মাধ্যমে ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পেরেছেন। নির্বাচনি প্রচারণায় তারা সরাসরি মানুষের কথা শুনছেন, সমস্যা জানছেন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলছেন। এতে করে তরুণ ভোটার ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যেও আগ্রহ বাড়ছে।
মানিকগঞ্জের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী এই দুই পরিবারের উত্তরসূরিদের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা না হলেও আলাদা দুটি আসনে তাদের সক্রিয়তা পুরো জেলার নির্বাচনি পরিবেশে উত্তাপ ছড়িয়েছে। বিএনপির ভেতরে ঐক্যবদ্ধ প্রচারণা এবং তৃণমূলের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নির্বাচনের ফলাফলে কী প্রভাব ফেলে, সেদিকেই এখন সবার নজর।
সব মিলিয়ে মানিকগঞ্জের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার নয়, বরং রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও জনসংযোগের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মঞ্চ হয়ে উঠেছে।










